সুন্দরবনের শিখা – প্রবীর জানা
ছোটোবেলায় আমার খুব ভূতের ভয় ছিল। বিশেষ করে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে ঘরের বাইরের দিকে তাকালে মনে হত দূরের গাছের জটলায় কেউ যেন হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। অন্ধকারে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে খুব ভয় পেতাম। মার শাড়ির আঁচল বা কারো হাত না ধরে একা একা রাত্রে চলাফেরা করতে সাহস হত না।
যখন খুব ছোটো ছিলাম, তখন ভূত সম্বন্ধে মনের মধ্যে ভয় সৃষ্টি হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। থাকতাম গ্রামের বাড়িতে। বাড়ির তিনদিকে বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠ, একদিকে খাল। গ্রামের যেখানে-সেখানে বাঁশ, কেয়া, বাবলা প্রভৃতি গাছের ঝোপ। গ্রামের পূর্বদিকে কিছুটা হাঁটলেই হুগলি নদী। সন্ধের অন্ধকারে শেয়াল, বনবিড়াল, খটাস বা কখনো কখনো হায়েনার দাপাদাপি প্রায়ই চোখে পড়ত। সে সময় বসন্ত, কলেরা যেমন মহামারীরূপে দেখা দিত, তেমনি ঝড়-বন্যায়ও অনেক মানুষের মৃত্যু হত। তাই যখনই কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটত তখন লোকে ব্যাপারটিকে বলত ভৌতিক। অর্থাৎ ভূতের ঘাড়ে সমস্ত দোষ চাপিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থেকে রেহাই পাওয়ার এটাই ছিল সহজ পথ। ভূত সম্বন্ধে শুধু সেকালে নয়, এখনও মানুষের মনে ভয়মিশ্রিত বিশ্বাস আছে। পরবর্তী সময়ে মন থেকে ভূতের ভয় বিদায় নিতে লাগল বয়স বাড়ার সাথে সাথে।
আমি তখন থাকি কলকাতার বাড়িতে। একবার শিখা এল আমাদের বাড়িতে সুন্দরবনের ভাসা গুড়গুড়িয়া নামক গ্রাম থেকে। সেখানে অনেক জমিজমা আছে তাদের। তার কাছে শুনেছিলাম যে তারা লাটদার। সে ডায়মন্ড হারবারে একটি কলেজে পড়াশুনো করে। তারা আমাদের আত্মীয়। তার বাড়ির অনেকে বিভিন্ন সময়ে আমাদের বাড়িতে এলেও শিখা এর আগে আসেনি। একটু চাপা গায়ের রং, কোমর পর্যন্ত দীর্ঘ মাথার চুল, খুব হাসি-খুশি ছিল সে। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। শিখা আসার পরে বাড়ির পরিবেশটাই যেন বদলে গেল। হাসি-ঠাট্টা, গল্প-গুজব, হইহুল্লোড়ের মধ্যে বেশ কয়েক দিন কেটে গেল।
বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় দেখলাম শিখাকে খুব গম্ভীর হয়ে যেতে।
আমি তাকে বললাম— শিখা, মনে হচ্ছে তোমার মন ভালো নেই। বাড়ি যাওয়ার জন্য ছটফট করছ। শুধু রাত্রিটা এখানে থাকছ, ভোরে তো চলে যাবে। সোজা দৃষ্টিতে সে তাকাতে পারল না আমার দিকে। তার দু-চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
সে বলল— আমি চলে গেলে বুঝি তুমি খুশি হবে, আমার কথা তোমার মনে পড়বে না?
সেদিন আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।
দীর্ঘ বছর কেটে গেছে, শিখার সাথে দেখা হয়নি আমার। আমিও তার কোনো খোঁজ রাখিনি। না রাখাই স্বাভাবিক। বাস্তব জীবনের স্রোতে কল্পনার ফানুস এইভাবেই বিলীন হয়ে যায়। বাস্তবের সাথে কল্পনার এখানেই ফারাক। একবার শিখার দাদা এসেছিল আমাদের বাড়িতে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
—শিখা এখন কী করছে?
সে বলল— সুন্দরবনের একটি স্কুলে শিক্ষিকার কাজ করে। স্কুলটি সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
আমি বললাম— সুন্দরবনের কোথায়?
—ধামাখালিতে এসে লঞ্চে নদী পেরিয়ে অপর পারে গেলে সন্দেশখালি। সেখান থেকে আরও কয়েক কিলোমিটার অটো, ট্রেকার বা ভ্যানরিকশায় গেলে শিখাদের স্কুলে পৌঁছানো যাবে।
আমি বললাম— একবার সুন্দরবনের পাথরপ্রতিমায় গেছলাম লঞ্চে। নদীর দুই তীরে গামা, হেতাল, গরান, কেওড়া আরও কত সবুজ সবুজ গাছপালা বাতাসে দুলতে দুলতে যেন হাতছানি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে। অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। গেছলাম একটি সাহিত্যসভায় যোগ দিতে। ফেরার সময় একজন কবি আমাকে এক বোতল মধু উপহার দিয়েছিলেন। কলকাতা শহরে দাম দিলেও খাঁটি মধু সহজে পাওয়া যায় না। একদিন সেখানে ছিলাম গলদা চিংড়ি, কাঁকড়া, জ্যান্ত জ্যান্ত মাছ দেখে মনে হচ্ছিল সেখানের লোকেরা খুব সুখে আছেন।
শিখার দাদা কিছু সময় চুপ থেকে বলল— সেখানে দু-চারদিন থাকলে বুঝতে পারতে লোকে কেমন ভয়ে ভয়ে থাকে।
—ভয়ের কথা বলছ কেন? লোকজন কম বাস করেন বলে কি চোর-ডাকাতের ভয়?
—চোর-ডাকাতের থেকে বেশি হিংস্র বাঘ, কুমির, সাপ প্রভৃতি। এখানে জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। ঘরে-বাইরে সর্বত্র সাপের উপদ্রব।
সেবার পুজোর ছুটিতে কলকাতার বাড়ি থেকে সকলে চলে গেল গ্রামের বাড়িতে। কলকাতায় পুজো দেখব বলে আমি একা থেকে গেলাম। সপ্তমীর রাত্রি। দেওয়াল ঘড়িতে একটা বাজল ঢং ঢং শব্দে। আমি চিলেকোঠার তিনতলার ঘরে চেয়ারে বসে পুজো ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছি। ঘরের দরজা আলত ভেজানো। এক ঝটিকা ঠান্ডা হাওয়ায় দরজার পাল্লা খুলে গেল। দেখলাম শিখা ধীর পদক্ষেপে ঘরে প্রবেশ করল। ঘরের আলোর জ্যোতি হঠাৎ কমে গেল। কখনো কখনো সিঙ্গল ফেজ হলে এরূপ হয়ে থাকে। আমি বললাম,
—শিখা, হঠাৎ তুমি! কলকাতায় পুজো দেখতে এসেছ বুঝি, একা না সাথে অন্য কেউ আছে?
সে আমার দিকে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। আমি যেখানে চেয়ারে বসে আছি তার পাশে খাটে বিছানা পাতা। শিখা এগিয়ে গিয়ে খাটে বসল মাথা নীচু করে। স্বল্প আলোয় দেখলাম তার শরীরের রং যেন নীলাভ হয়ে গেছে। যখন আমাদের বাড়িতে সে এসেছিল তার গায়ের রং চাপা হলেও লাবণ্যের ঘাটতি ছিল না। সে ছিল খুব হাসি-খুশি। আজ যেন ক্লান্ত। চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে, অবিন্যস্ত মাথার চুল, তার পরনের শাড়িটা দুমড়ানো, মোচড়ানো, ঠোঁট যেন রক্তের মতো লাল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম— তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, খুব ক্লান্ত। সে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
আমি আবার বললাম— তোমার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করব কি? দুধ- মুড়ি আছে খেতে পার। চা করে আনব?
সে ঝিমাতে থাকল যেন ঘুমে ঢলছে। কিছু সময় পরে চাপা গলায় বলল,
—কথা দিয়েছিলাম তোমাকে ভুলে যাব না। তুমি বলেছিলে, সুন্দরবনে যাবে আমার সাথে দেখা করতে। তুমি তো কথা রাখনি। আমি এসেছি দেখা করতে।
—তুমি হঠাৎ আসায় আমি খুব খুশি হয়েছি। কিন্তু…।
—কিন্তু কী?
—তোমাকে আগের মতো প্রাণচঞ্চল মনে হচ্ছে না যেন।
চোখের পাতা অল্প খুলে তাকাল সে আমার দিকে। তারপর ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, প্রাণ থাকলে তো চঞ্চলতা প্রকাশ পাবে!
আমি হেসে বললাম— প্রাণ না থাকলে এখানে এলে কী করে, ভূত হয়ে নাকি?
‘ভূত’ শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথে শিখার চোখ দুটো জ্বল জ্বল করতে থাকল, যেন আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরিয়ে আসছে।
ভাবলাম, ভূতের সাথে তুলনা করায় হয়তো সে রেগে গেছে। হাসতে হাসতে বললাম, ভালোবাস বলেই তো সামান্য কথায় দাদার ওপর রাগ- অভিমান করছ! ভাই-বোনে এসব হয়েই থাকে।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শিখা বলল- তুমি ভালোবাস না ছাই, তুমি…।
শিখা ঘুমে অচৈতন্য হয়ে বিছানার কোলে ঢলে পড়ল। ঘরের আলো অস্পষ্ট হতে হতে নিভে গেল। আমি বাধ্য হয়ে দোতলার ঘরে ঘুমাতে চলে এলাম।
খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনতলার চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে দেখি শিখা সেখানে নেই। বাড়ির চারদিকে উঁচু প্রাচীর। গেটে তালা দেওয়া। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তাকে কোথাও দেখলাম না। বিস্মিত হলাম এজন্য যে গেটে তালা দেওয়া সত্ত্বেও কী করে সে বাইরে চলে গেল!
এই ঘটনার কিছুদিন পরে ছিল পঞ্চায়েত ভোট। সরকারি কর্মচারী হওয়ায় আমার ভোটের ডিউটি পড়ল সুন্দরবনের গ্রামে একটি স্কুলে। গ্রামটির নাম হুঁকাহারানি। ভোটের বুথ সেই স্কুলে। আমার কাজ প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করা। সবুজ অরণ্য, খাল-বিল, নদীর শোভা আমার মনকে খুবই আকৃষ্ট করল। শুনেছি শিখার বাড়ি এসব অঞ্চলে কোথাও হবে। তাই তার কথাও বার বার মনে পড়ছিল। ভোটের আগের দিন আমরা, যারা ভোটের দায়িত্ব প্রাপ্ত, সন্ধ্যায় হাজির হয়েছিলাম নির্দিষ্ট স্কুলে। এখানে এসে খুবই ভালো লাগছিল। শহরের জনঅরণ্য, গাড়ি-বাড়ির একঘেয়েমি থেকে গ্রামের নির্জনতা, রূপসী পল্লীর হাতছানি আমার খুব ভালো লাগছিল।
সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসার পরে বুঝতে পারলাম বাস্তব আর কল্পনা অনেক সময় এক হয় না। সাইকেল ম্যাসেঞ্জার এসে বললেন, স্যার, এখানের পরিবেশ ভালো নয়। ভোটের সময় প্রায়ই গণ্ডগোল হয়। রাত বাড়ার সাথে সাথে কাছাকাছি অঞ্চল থেকে বোমের শব্দ ভেসে আসতে থাকল। আমি সাইকেল ম্যাসেঞ্জারকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথাও কি পুজো হচ্ছে, বোমের শব্দ ভেসে আসা আসতে থাকল। আমি সাইকেল ম্যাসেঞ্জার হাসতে হাসতে বললেন, কাল যে ভোট পুজো হবে তার প্রস্তুতি চলছে।
—মানে!
—এখন থেকে বিভিন্ন দলের লোকেরা নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে। আগে অনেকবার ভোটের সময় এখানে গণ্ডগোল হয়েছে বুথের বাইরে। বুথের ভেতরে এসে কেউ গণ্ডগোল করতে সাহস করেনি।
ভোটের দিন সকাল থেকে ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রায় শান্তিতে কাটল বলা যায়। বুথের সীমানার মধ্যে কোনো গণ্ডগোল হয়নি। ভোট পর্বের পরের কাজ শেষ করে ঘড়িতে দেখলাম তখন রাত প্রায় আটটা। যেখান থেকে ভোটের মালপত্র নিয়ে রওনা হয়েছিলাম, সেখানে সিল করা ব্যালট বাক্স এবং অন্যান্য জিনিসপত্র জমা দিলে তবে আমাদের ছুটি। এখানে দূরে যাতায়াতের মাধ্যম নৌকো। শুধু আমরা নয়, আরও কয়েকটি বুথের ভোটকর্মী, মালপত্র, পুলিশ জড়ো হয়েছে একটি নদীর পাড়ে। জ্বলছে হ্যারিকেনের অস্পষ্ট আলো। আমরা ডাঙায় দাঁড়িয়ে আছি। মালপত্র নৌকোয় তোলা হচ্ছে। আমাদের থেকে কয়েকগজ দূরের ঝোপের আড়ালে ব্লাস্ট করল পর পর দুটো বোম। আমরা দৌড়াতে শুরু করলাম ভয়ে।
আমি নদীর তীর বরাবর দৌড়াতে দৌড়াতে একটা গাছের আড়ালে গিয়ে থামলাম। নদীর লোনা জলের ঢেউয়ে জ্বলে উঠছে ফসফরাসের আলো মাঝে মাঝে। তাকিয়ে দেখলাম, কেউ আমার দিকে এগিয়ে আসছে, তার ছায়া নদীর জলে মাঝে মাঝে ভেসে উঠছে। যতই ভাবছি কোন দিকে দৌড়াব ততই আমার পা দুটো যেন আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে ভয়ে। শুনতে পেলাম, গাছের আড়াল থেকে কেউ বলছে,
—আশিসদা, ভয় পেয়ো না, আমি তো আছি।
মনে হল এই গলা তো আমার চেনা, খুব ভালো করে চিনি। একজনই আমাকে এত মিষ্টি গলায় দাদা বলে ডাকে। আমি হতবাক এই গলার স্বর শুনে। রাতের অন্ধকারে সে এখানে কেন এল! মনের ভুল নয়তো? শুনেছি, বনজঙ্গলে নাকি ভূত-পেত অশরীরী আত্মার অবাধ বিচরণ রাতের অন্ধকারে! হয়তো এরূপ কোনো শক্তি বিপদে ফেলার জন্য অভয়বাণী শোনাচ্ছে। যখন এসব ভাবছি তখন এক নারীমূর্তি আমার সামনে হাজির হয়ে বলল,
—আমি থাকতে তোমার শরীর ছোঁয়ার হিম্মত কারো নেই। যারা ব্যালট বাক্স ছিনতাই করতে এসেছিল তারা পুলিশের তাড়া খেয়ে পালিয়ে গেছে। অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছ। আমার পিছু পিছু আসো, তোমাকে লোকজনের কাছে পৌঁছে দিই।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম— শিখা, তুমি এখানে! আমি বিপদে পড়েছি যে তা তুমি জানলে কী করে?
শিখা ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল— দাদা বিপদে পড়লে বোনের জানতে পারা তো স্বাভাবিক ব্যাপার!
নদীর ঢেউয়ে জেগে ওঠা ফসফরাসের আলো ঢেউ খেলে যাচ্ছে শিখার চোখ-মুখ সারা শরীরে। তার চোখ থেকে যেন আগুনের হলকা ছিটকে বেরিয়ে আসছে। সেই আলোয় তাকে অনুসরণ করা সহজ হচ্ছিল। কিন্তু অস্পষ্ট আলোয় শিখাকে মনে হচ্ছিল যেন একটা কঙ্কাল লম্বা লম্বা পা ফেলে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যাচ্ছে আমার সামনে।
ফিরে এলাম যেখানে ভোটের মালপত্র ফেলে পালিয়ে গেছলাম সেখানে। বহু পুলিশ ও র্যাফ এসে গেছে। তারা পাহারা দিয়ে ব্যালট বাক্স প্রভৃতি নৌকায় করে পৌঁছে দিল নির্দিষ্ট স্থানে। এরপর যখন ভোটের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেলাম তখন প্রায় সকাল হয়ে আসছে। শিখার সাথে অপ্রত্যাশিতভাবে সাক্ষাৎ এবং নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিয়ে তার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া আমার মনে হয় মিশ্রিত চিন্তার সৃষ্টি করল। দূরের অন্ধকারের দিকে তাকালেই মনে হতে থাকল, কেউ যেন ঘোরাফেরা করছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, ভোরের আগে এখান থেকে চলে যাওয়া নিরাপদ হবে না।
অনেকেই সেখানে অপেক্ষা করছেন। আমি বিশাল প্যান্ডেলের একপ্রান্তে একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করছি। এমন সময় একজন লোক আমার সামনে এসে বললেন,
—আপনাদের বুথে নাকি গণ্ডগোল হয়েছিল শুনলাম।
আমি লোকটির মুখের দিকে তাকালাম। মনে হল কোনো ভোটকর্মী হয়তো হবেন। তাঁর শরীরে অস্বাভাবিকতার কোনো চিহ্ন আমার চোখে ধরা পড়ল না। আসলে এক অজানা ভয় তখন আমাকে তাড়া করছে, বিনা কারণে মনে সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে।
—আমি বললাম, বুথে নয় নৌকোয় মালপত্র তোলার সময়। আপনি গণ্ডগোলের খবর জানলেন কী করে?
—আপনি তো আচ্ছা মানুষ মশায়! এখানের সকলে জানে, শুধু আমি একা নয়।
—আপনি নিশ্চয় ইলেকশন ডিউটি করতে এসেছেন?
—ঠিক বলেছেন। আমি যেখানে গেছলাম সেখানের পরিবেশ খুবই ভালো। সকলে সতর্ক ছিল, কোনো গণ্ডগোল না হয় যেন।
—আপনি কি রাজ্য না কেন্দ্রীয় সরকারের
—হাই স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক। আমার নাম গোবিন্দপ্রসাদ কর।
—আপনি থাকেন কোথায়?
—ভাসা গুড়গুড়িয়ায় গ্রামের বাড়ি আছে। আমার কর্মস্থল রায়দিঘিতে হওয়ায় থাকি সেখানে স্কুল হোস্টেলে।
—ভাসা গুড়গুড়িয়ায় আমার আত্মীয় বাড়ি আছে। শিখা নামে তাদের একটি মেয়ে সন্দেশখালিতে মাস্টারি করে।
শিখার কথা বলতে লোকটি গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছু সময় পরে ভারাক্রান্ত গলায় বললেন,
—আপনি মনে হয় শিখা সামন্তের কথা বলছেন?
—ঠিক বলেছেন। আপনি তাকে কি চেনেন?
—চিনব না কেন, আমার বাড়ির কাছেই সামন্তদের বাড়ি। শিখা তো এখন নেই।
—নেই মানে?
—আপনার আত্মীয়, অথচ তার খবর রাখেননি!
—শিখারা আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয় হয়। একসময় তারা আমার কলকাতার বাড়িতে আসত। দীর্ঘদিন তাদের সাথে যোগাযোগ নেই।
—সে দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন রাত্রি প্রায় একটার সময় ধামাখালি গ্রামীণ হাসপাতালে সাপের কামড়ে মারা গেছে। তখনও ভোরের আলো ঠিকমতো ফুটে ওঠেনি। শিখা হেঁটে আসছিল অটোরিক্সা স্টান্ডের দিকে স্কুল হোস্টেল থেকে বেরিয়ে। স্কুলে পুজোর ছুটি পড়ে গেছে। অটোতে এসে সন্দেশখালি নদী পেরিয়ে ধামাখালি হয়ে ভাসা গুড়গুড়িয়া আর তার আসা হল না। সারাদিন চলল যমের সাথে তার বাঁচার লড়াই। শেষপর্যন্ত সে হার মানল। ডেডবডি গ্রামে আনা হয়েছিল। নীল হয়ে গেছল বিষে। কী ভালো মেয়ে ছিল সে! সারা গ্রামের মানুষ আছড়ে পড়েছিল ডেডবডির কাছে। সকলের চোখে জল।
আমি বললাম— গোবিন্দবাবু, আপনি বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ভূত, আত্মা— এসবে কি বিশ্বাস করেন?
—এমন প্রশ্ন কেন করছেন?
শিখার মৃত্যুর দিন আমাদের কলকাতার বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে ঠিক রাত্রি একটায় এবং আজ সন্ধ্যায় নদীর নির্জন তীরে তার সাথে আমার দেখা করার ঘটনা খুলে বললাম গোবিন্দবাবুকে।
গোবিন্দবাবু বললেন— আগে ভাবতাম ভূত, আত্মা বলে কিছু নেই। এসব মানুষের অলীক ধারণামাত্র। পি টি আই ২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর একটি খবর প্রকাশ করে। তারপরে আমার মনে হয়েছে আত্মার অস্তিত্ব স্বাভাবিক ব্যাপার। লন্ডনের সাদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার পনেরোটি হাসপাতালে পরীক্ষা চালিয়েছেন প্রায় দু-হাজার রোগীর ওপর, যাদের প্রায় মৃত বলা যেতে পারে। হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কুড়ি থেকে ত্রিশ সেকেন্ড পর্যন্ত মস্তিষ্ক কাজ করতে পারে। এই রোগীদের প্রাথমিকভাবে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করা হয়। কৃত্রিম যন্ত্রের সাহায্যে এইসব রোগীদের হৃদযন্ত্র সচল করা হয় ত্রিশ সেকেন্ডের অনেক পরে। সাদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন বিজ্ঞানী, নিউইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটির সাথে যুক্ত ড. শ্যাম পারনিয়া জানিয়েছেন, একজন রোগীর আত্মা দেহ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল, যার বয়স সাতান্ন বছর এবং তিনি একজন সমাজকর্মী। দি টেলিগ্রাম পত্রিকার প্রতিবেদনে জানা গেছে তিন মিনিট পরে কৃত্রিম উপায়ে এই রোগীর শ্বাসযন্ত্র কার্যকরী করা হয়। ডাক্তার জানিয়েছেন, রোগী সংজ্ঞাহীন থাকলেও হুবহু বর্ণনা করেছেন সেদিন ঠিক ঠিক কী ঘটেছিল, ডাক্তার ও সেবিকার কী ভূমিকা ছিল। এমনকি কোন যন্ত্রে ঠিক কী ধরনের আওয়াজ হচ্ছিল। মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে তিনি দেহ ছেড়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থেকে এসব দেখছিলেন। দু-হাজার ষাট জন হৃদরোগীর তথ্য থেকে জানা গেছে, তাঁদের এক ধরনের চেতনা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। প্রতি তিনজনের একজন বলেছেন, তাঁদের সময়ের ধারণাটা বদলে গিয়ে কারো মনে হচ্ছে দ্রুত কারো মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে সময় কাটছে। কেউ দেখছেন উজ্জ্বল আলো, কারো মনে হয়েছিল সূর্যের আলো ঝলকাচ্ছে।
আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, বিজ্ঞানকে অস্বীকার করতে পারি না। তাই মৃত্যুর পরে শিখা যে আপনার সাথে দেখা করেছে তা ভুল নয়।
আমার বার বার মনে হচ্ছিল— সে সত্যি আমাকে ভালোবাসে, মৃত্যুর পরেও।
[ ছুটির ছুটি (নির্মল বুক এজেন্সী), ২০১৫]
