স্নেহ – সুচিত্রা ভট্টাচার্য
অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়েছিল অবনী। কম দূরের পথ তো নয়। হাওড়া থেকে ট্রেনে চাপলে পাক্কা সওয়া ঘণ্টা লাগবে বাগনান, সেখান থেকে বাস কিংবা অটোয় মানকুর ঘাট আরও চল্লিশ মিনিট। তারপর ভুটভুটিতে হটুগঞ্জ আরও কম সে কম আধা ঘণ্টা। পিসিঠাম্মার বাড়ি পৌঁছানো কি মুখের কথা? অথচ না গেলেও তো নয়। সকালেই ফোন এসেছিল, পিসিঠাম্মার আবার নাকি শরীর খারাপ। ইদানীং মাঝে- মাঝেই ভুগছেন বাবার এই একমাত্র পিসিটি। ভোগারই কথা অবিশ্যি। বয়স তো নেহাত কম নয়, আশি পেরিয়েছেন বহুদিন। অবনীর বাবা অনেকবার তাঁকে কলকাতায় নিজের কাছে এনে রাখতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি শ্বশুরবাড়ির ভিটে ছেড়ে নড়লে তো। কী যে জেদ! আত্মীয়স্বজন নেই, ছেলেপুলে নেই, একটিমাত্র কাজের মেয়ের ভরসায় হটুগঞ্জেই পড়ে আছেন স্বর্ণকুমারী দেবী।
এবার মনে হয় অসুখটা বেশ গুরুতর। সকালে হটুগঞ্জ থেকে যে লোকটি ফোনে খবর দিল, তার গলা শুনে তো অবনীর বাবা বেশ উদবিগ্ন হয়ে পড়েছেন। অবনীকে বললেন, ‘কী করি বল তো? আমিই চলে যাব?’
এম এ পাশ করার পর নতুন চাকরিতে ঢুকে অবনী এখন যথেষ্ট হেক্কড়। গ্রাম্ভারী মুখে বলল, ‘না, না, তোমার শরীরস্বাস্থ্য ভালো নয়। ঘঙ ঘঙ কাশছ, এখন সিজন চেঞ্জের টাইম…।’
‘কিন্তু কাউকে তো একটা যেতেই হবে রে। অসুস্থ মানুষটার খোঁজ তো নিতেই হবে।’
‘কেন, আমি আছি। আমি যাব। অফিস করে আজ আর বাড়ি ফিরব না। সোজা চলে যাব হটুগঞ্জ।’
‘তুই পারবি?
‘আমি কি আর কচিখোকা আছি নাকি? তুমি আমার উপর ভরসা রাখো। তেমন বুঝলে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে সোজা কলকাতায় নিয়ে চলে আসব।’
‘গুড ডিসিশন। আর সেই সময় পিসিকে বলে দিবি, তাঁর আর হটুগঞ্জে থাকা চলবে না। এখন থেকে তিনি এই একমাত্র ভাইপোটির বাড়িতেই অবস্থান করবেন।’
পাঁচটায় হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে অবনী ভেবেছিল আটটা নাগাদ ঢুকে যাবে হটুগঞ্জ। কিন্তু কপাল খারাপ। কোথায় যেন ওভারহেডে তার ছিঁড়েছে, ট্রেন চলাচল আপাতত বন্ধ। ঘণ্টাখানেক পর যাও বা চালু হল ট্রেন, তাও চলে ঢিকিস-টিকিস করে। ভিড়ে ঠাসা গাড়ি বাগনান পৌঁছোতেই আটটা বাজিয়ে দিল। অটোয় এক মাইল লম্বা লাইন, অগত্যা বাসই ভরসা। মানকুর ঘাটে, রূপনারায়ণের পারে, অবনী যখন নামল, শেষ ভুটভুটি তখন ছাড়ব ছাড়ব করছে। সেই ভুটভুটি হটুগঞ্জে ভিড়ল প্রায় সাড়ে দশটায়। হটগঞ্জে তখন নিশুতি রাত।
বাজারহাট বন্ধ। দোকানে ঝাঁপ পড়ে গিয়েছে। রিকশা, ভ্যানরিকশা, কিচ্ছু নেই। অবনীর সঙ্গে আর তিন-চারজন যাত্রী নেমেছিল, তারাও চলে গেল যে-যার মতো। একটু যেন ফাঁপরে পড়ল অবনী। জায়গাটা তার অপরিচিত নয়, এখানে সে এসেছে বেশ কয়েক বার। সেই ছেলেবেলা থেকেই। কিন্তু বাড়ির দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে পিসিঠাম্মার কাছে যাবে, এই ভাবনায় টগবগ ফুটছিল উৎসাহে। এখন পথশ্রম আর চারদিকের হালহকিকত দেখে একটু যেন দমে গিয়েছে।
দু-চার মিনিট ঝুম দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে উজ্জীবিত করল অবনী। পিসিঠাম্মার কুসুমপুর গ্রাম তো মোটে দু-কিলোমিটার রাস্তা, পথটাও তার মুখস্থ, পয়দল মেরে দিলেই তো হয়।
ব্যস, ভাবামাত্র হনটন শুরু। গঞ্জ মতো জায়গাটা পেরিয়ে অবনী মেঠো রাস্তা ধরল। শুক্লপক্ষের রাত, আজ বোধ হয় দশমী-একাদশী হবে, দিব্যি একটা চাঁদ উঠেছে, জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চতুর্দিক। অঘ্রান মাস, এখনও তেমন ঠান্ডা পড়েনি, মিহি হিমের আমেজটা বেশ লাগে। দু-পাশে ধানখেত, পুরো ধান কাটা হয়নি, হালকা কুয়াশামাখা মাঠঘাটও যে এখন কী অপরূপ! মনে হয় কে যেন ফিনফিনে রুপোলি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে চরাচরে।
হেলেদুলে হাঁটতে-হাঁটতে খোশমেজাজে গুনগুন গান ধরেছিল অবনী। হঠাৎই তার মনে পড়ল, সে যাচ্ছে তার অসুস্থ পিসিঠাম্মাকে দেখতে। এই সময় এমন খুশি-খুশি থাকাটা কি তার শোভা সিপ্রায়? হয়তো সেই মানুষটার এখন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, হয়তো যন্ত্রণায় ককাচ্ছেন… অবনী কোথায় তাড়াতাড়ি তাঁর কাছে পৌঁছোবে তা নয়, সে কিনা প্রকৃতির শোভায় বিভোর। ছিঃ!
অবনী দু-পায়ের গতি বাড়াল। বাঁ-দিকে পুকুর আর প্রকাণ্ড বট গাছটা পেরিয়ে চলে এসেছে কুসুমপুর। রাস্তা শুনশান, জনপ্রাণীর দর্শন নেই। বড়ো ফুটবল মাঠখানা পেরিয়ে পিসিঠাম্মার বাড়ির দোরগোড়ায় এসে থামল অবনী।
একতলা পাকাবাড়ি। বেঁটে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ভিতরে উঠোনের কোণটায় একটা দারুণ পেয়ারা গাছ আছে। অবনী জানে।
গলা উঁচিয়ে ‘পিসিঠাম্মা’ বলে ডাকতে গিয়েও অবনী নিজেকে সংযত করল। কড়া নাড়ল দরজার।
কীমাশ্চর্যম! মুহূর্তে সদর খুলে গিয়েছে। এবং সামনে স্বয়ং পিসিঠাম্মা! হাতে একটা টিমটিমে লন্ঠন।
একগাল হেসে পিসিঠাম্মা বললেন, ‘এসে গিয়েছিস তা হলে? জানতাম তুইই আসবি।’
অবনী অবাক মুখে বলল, ‘তুমি না অসুস্থ? তুমি উঠে এলে কেন?’
‘কে আর দরজা খুলবে বল? সরস্বতী বাড়ি গিয়েছে যে।’
‘কী কাণ্ড! তোমার অসুখের মধ্যেও সে বাড়ি চলে গেল?’
‘কোথায় অসুখ। আমি তো দিব্যি আছি।’
‘কিন্তু সকালে কুসুমপুর থেকে ফোন গেল যে?’
‘না হলে কি তোদের কারও দর্শন মিলত?
‘তাই বলো’, অবনী হাসল, তুমি ভারি দুষ্টু হয়েছ তো?’
স্বর্ণকুমারী হাসলেন যেন। বললেন, ‘আয় ভিতরে আয়।
উঠোন পেরিয়ে চওড়া বারান্দায় উঠল অবনী। স্বর্ণকুমারীর পিছু-পিছু। কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে জুতো ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘লণ্ঠন নিয়ে ঘুরছ কেন? কারেন্ট নেই?
‘তাই তো দেখছি,’ সামান্য কুঁজো হয়ে হেঁটে বাঁ-দিকে বড়ো ঘরটায় ঢুকলেন স্বর্ণকুমারী। বললেন, ‘এটা আজ তোর ঘর। গরম তো নেই, ফ্যান না চললে তোর নিশ্চয়ই অসুবিধে হবে না?’
‘একটুও না।’
‘এখন কী খাবি বল? নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে?’
এতক্ষণ ক্ষুধাতৃষ্ণার বোধই ছিল না অবনীর। স্বর্ণকুমারীর প্রশ্নে টের পেল, পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। সেই কখন ট্রেনে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি খেয়েছিল, তারপর তো আর কিছুই যায়নি পাকস্থলীতে। তবু এই বৃদ্ধা মহিলা এত রাতে তার খাওয়া নিয়ে উদ্ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, সেটাও তো ভালো দেখায় না।
অবনী তাড়াতাড়ি বলল, ‘ও নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না পিসিঠাম্মা। মুড়িটুড়ি গোছের কিছু থাকলে দাও, খেয়ে শুয়ে পড়ি।’
‘তা বললে হয়? কদ্দিন পর এলি…।’
‘তো? তাই বলে এই রাতবিরেতে তুমি রাঁধতে বসবে?’
‘দূর বোকা, রান্না তো আমার করাই আছে। ভাত, মুগের ডাল, বাঁধাকপির তরকারি, আলুপোস্ত, বড়ির ঝোল, ফুলকপির ডালনা… নতুন গুড়ের পায়েস পর্যন্ত বানিয়ে রেখেছি। তুই শুধু কোনটা কোনটা খাবি বল?’
খাবারের তালিকা শুনে অবনীর জিভে জল আসার জোগাড়। প্রতিটি পদই তার খুব প্রিয় কিনা। নিরামিষ এই রান্নাগুলো পিসিঠাম্মার হাতে খোলেও দারুণ। একবার খেলে পাক্কা এক বছর মুখে লেগে থাকে।
তবু বিস্মিত গলায় অবনী বলল, ‘তুমি একা হাতে এত কিছু রেঁধেছ?’
‘আমার অসুবিধে হয়নি। এখন তুই তৃপ্তি করে খেলে পরিশ্রম সার্থক হয়।’
‘বলছ? তা হলে চেটেপুটে খাব।’
‘খুব ভালো। যা, উঠোনের টিউবওয়েলটায় হাতমুখ ধুয়ে আয়। আমি ততক্ষণ ভাত-টাত বাড়ি।’
গুটিগুটি পায়ে লন্ঠন হাতে হেঁশেলে গেলেন স্বর্ণকুমারী। প্যান্টশার্ট ছেড়ে ব্যাগে রাখা পাজামা-পাঞ্জাবি গলিয়ে নিল অবনী। জলের ছোঁয়ায় তরতাজা হয়ে সটান পিসিঠাম্মার রান্নাঘরে। সেখানে এক এলাহি আয়োজন। বাহারি ফুলকাটা আসন পেতে দিয়েছেন স্বর্ণকুমারী। কাঁসার থালায় ফুরফুরে ভাত। থালা ঘিরে সার-সার বাটি।
হাসতে হাসতে অবনী বলল, ‘এ যে রয়্যাল ডিনার পিসিঠাম্মা!’
স্বর্ণকুমারী লাজুক মুখে বললেন, ‘কবে আবার অসিস, আমার রাঁধার ক্ষমতা থাকে না-থাকে…।’
ভাতে হাত দিয়ে ফের চমক। অবনী বলে উঠল, ‘কিন্তু এ তো রীতিমতো গরম গো! ভাত কি এক্ষুনি নামিয়েছ?
‘শীতের রাতে ঠান্ডা ঠান্ডা দেওয়া যায় নাকি?… একটু ঘি দিই পাতে?’
‘ওফ, তুমি তো কিছুই বাকি রাখলে না! দাও।’
খাওয়া শুরু করল অবনী। ঘি-ভাতের পর ডাল, আলুপোস্ত, বাঁধাকপির তরকারি একের-পর-এক উপুড় হচ্ছে পাতে। মুখে তুলেই মুহুর্মুহু তারিফ বাজছে অবনীর গলায়।
খেতে খেতে অবনী বলল, ‘নাহ, বাবা যা বলেছেন সেটাই করতে হবে।’
‘কী রে? আমায় কলকাতায় নিয়ে যেতে বলেছে, তাই না?’
‘ঠিক ধরেছ। তুমি এখানে থাকলে আমাদের বহুত সমস্যা। প্রথমত, তোমার শরীর খারাপ হলে আমরা হুটহাট ছুটে আসতে পারি না। সেকেন্ডলি, তুমি কীভাবে আছ তাই নিয়ে আমাদের টেনশন হয়…’
‘আর ভাবিস না। আমি ভালো আছি, ভালো থাকব।’
‘ওইসব বলে আমাদের কাটাতে পারবে না। তুমি কলকাতায় না থাকলে এমন বিউটিফুল রান্নাগুলো যে আমরা মিস করি।’
‘সেই জন্যে তো আজ অনেক কিছু রেঁধে খাইয়ে দিলাম। আর হয়তো কোনোদিনই রান্নাঘরে ঢুকব না।’
‘তা হোক। তুমি রাঁধো না-রাঁধো, আমাদের সঙ্গে থাকবে চলো। বাবা তোমার জন্য কতটা উতলা থাকেন জানো? বার বার বলেন, ‘আমার একমাত্র পিসিটা গাঁয়ের বাড়িতে একা-একা কাটাচ্ছে, আমরা তার সেবাযত্ন করার সুযোগ পাচ্ছি না, ভাবলেই আমার কান্না পায়।’
‘তোরা বড্ড ভালো রে অবনী। আমাকে নিয়ে তোরা খুব চিন্তাভাবনা করিস।’
‘করিই তো,’ সাপটে-সুপটে নতুন গুড়ের পায়েস শেষ করছিল অবনী। ঠোঁট চাটতে চাটতে বলল, ‘সুতরাং আর কোনো ওজর আপত্তি নয়। কালই তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ। ফরএভার।’
‘আর এ বাড়িটার কী হবে?’
‘তালাবন্ধ পড়ে থাকবে। তোমার পড়শিদের বলে দেব, তারা ওয়াচ রাখবে। তোমার ঘরে এমন কিছু তো সোনাদানা নেই…’
‘তা বললে হয় রে সোনা? কত স্মৃতি আছে এখানে। সেগুলোই তো আমার মণিমুক্তো হিরেজহরত। সেই কত বছর আগে তোর পিসদাদুর সঙ্গে এ বাড়িতে পা রেখেছিলাম। তখন ছিল মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল। তারপর আস্তে আস্তে দালানকোঠা হল, কর্তামশাই এখানে দেহ রাখলেন। তাঁকে ফেলে, এই ঘরবাড়ি ছেড়ে কোথাও গিয়ে আমি শান্তি পাব না রে, স্বর্ণকুমারী মাথা নাড়লেন, ‘তার চেয়ে এখানেই থাকি। তোদের ওখানেও মাঝে যাব।’
‘আমরা না নিয়ে গেলে যাবে কী করে? ভ্যানরিকশা, ভুটভুটি, অটো, বাস… পারবে এই বয়সে একা একা?’
‘তা হলে নয় উড়েই চলে যাব। ইচ্ছে থাকলে মানুষ কী না পারে।’
নাহ, এই অশীতিপর মহিলাকে বাগে আনা অবনীর কম্মো নয়। উঠে আঁচিয়ে অবনী ঘরে ফিরল। তখনই মনে হল, পিসিঠাম্মার খবরটা তো বাড়িতে জানানো উচিত। এত রাতে ফোন করবে? থাক গে, না হয় কাল সকালে…। উঁহু, বাবা-মা নিশ্চয়ই চিন্তায় আছেন…।’
দোনামোনা করতে করতে মোবাইল ফোনখানা বের করল অবনী। ধুস, টাওয়ার নেই! কোনো মানে হয়!
স্তিমিত লণ্ঠন হাতে দরজায় এসেছেন স্বর্ণকুমারী। নরম স্বরে বললেন, ‘আর জেগে থাকিস না সোনা। আজ এত ধকল গেল, কাল সকালে আবার তোর ছোটাছুটি আছে…। মশারি টাঙিয়ে ঘুমিয়ে পড়।’
সত্যি, আর যেন শরীর চলছিল না অবনীর। বালিসে মাথা রাখতেই ডুবে গিয়েছে গাঢ় নিদ্ৰায়।
ঘুম ভাঙল কাকভোরে। বাইরে বেরিয়ে আড়মোড়া ভাঙছে, চোখ গেল পাশের ঘরগুলোয়। কী কাণ্ড, তালা ঝুলছে! পিসিঠাম্মা কি ভোরবেলাতেই খুটখুট করে বেরিয়ে গেল? ইস, ঠান্ডা লেগে যাবে না?
ভাবতে ভাবতেই অবনী বাড়ির বাইরে এসেছে। তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। হঠাৎ এক প্রবীণ ভদ্রলোকের আবির্ভাব। অবনীর মুখচেনা। স্থানীয় স্কুলের মাস্টারমশাই। থাকেন পাশের বাড়িতেই।
অবাক মুখে ভদ্রলোক বললেন, ‘তুমি এসে গিয়েছ?’
‘হ্যাঁ। কেন?’
‘আমরা কাল রাতে কলকাতায় ফোন করলাম, তোমার বাবা বললেন, তুমি রওনা দিয়েছ… সেই মতো রাত এগারোটা অবধি এ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে…। কখন এলে?’
‘আরও রাতে। দেরি হয়ে গেল।’
‘যাক গে যাক, চলো।’
‘কোথায়?’
‘হাসপাতালে। রাতভর মাসিমার বডিটা ওখানে পড়ে আছে, এবার তো সৎকারের কাজটা সেরে ফেলতে হয়।’
‘মাসিমা মানে?’
‘স্বর্ণকুমারী দেবী। তোমার পিসিঠাকুরমা। কাল সকাল থেকে ওঁর শ্বাসকষ্টটা খুব বেড়েছিল, তোমাদের খবর দেওয়ার পর ওঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল। অনেক চেষ্টা করেছিলেন ডাক্তার। ফেরানো গেল না। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ উনি…। তোমার বাবাকে আমি ডিটেলে বলেছি। উনি তোমাকে মোবাইলে জানাননি?’
‘না মানে…আমার ফোনের টাওয়ারটা…।’
বলেই এক ছুটে ঘরে গিয়েছে অবনী। মোবাইল অন করে বিস্ফারিত চোখে দেখল, টাওয়ার এসে গিয়েছে!
অবনী থতমত মুখে বলল, ‘কিন্তু কাল আমি… আমার সঙ্গে পিসিঠাম্মার…।’
‘মন খারাপ কোরো না,’ ভদ্রলোক অবনীর পিঠে হাত রাখলেন, ‘তোমার পিসিঠাকুরমা খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। ইদানীং তো প্রায় চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়েছিলেন। মৃত্যুতে তাঁর এক ধরনের মুক্তি হল বলতে পার।’
অরনীর গলায় আর কোনো স্বর ফুটল না। পা দু-খানা যেন গেঁথে যাচ্ছে মাটির মধ্যে। কাল রাত্তিরে যা যা ঘটল, তা কি সত্যি নয়? কিন্তু পেটটা গজগজ করছে কেন? মনে হল, বড়ির ঝোলের একটা ঢেকুরও উঠল যেন। পায়েসের স্বাদটাও স্মরণে এল অবনীর…।
সব মিথ্যে? সব? কী করে হয়? এ যেন প্রহেলিকা।
[ আনন্দমেলা, ৫ মাৰ্চ ২০১৩ ]
